Followers

Wednesday, October 4, 2017

ইনকিউবেটরে টার্কীর ডিম ফুটানোর কৌশল ও প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা।


টার্কি খামারীদের অন্যতম সমস্যা হ্যাচিং রেইট। ডিমের ভিতরে পূর্নাঙ্গ বাচ্চা থাকা স্বত্বেও বাচ্চা ডিমের ভিতর থেকে বের হতে পারে না। মূলত যারা এবিষয়ে দক্ষ তারা অন্যদেরকে শেখাতে চান না বা সময়ের অভাবে শেখান না। তাই আমরা পর্যায় ক্রমে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আমাদের এই আলোচনায় আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন যাতে সকল টার্কি খামারীগণ উপকৃত হতে পারেন। এই বিশ্লেষণ মূলক লেখাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতমঃ
১/ ফার্টাইল (উর্বর) ডিমের পরিচর্যা২/ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন
৩/ হিউমিডিটি (আদ্রতা) নিয়ন্ত্রন
৪/ হ্যাচিং পদ্ধতি
ফার্টাইল (উর্বর) ডিমের পরিচর্যা" বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ
১. খামার থেকে ডিম সংগ্রহ করুন এবং ডিম সংরক্ষনের খাচাকে খুব ভাল করে পরিষ্কার করে শুকনো খড়ের উপরে রাখুন। ডিম প্রতিদিন ভোর বেলায় সংগ্রহ করতে হবে এবং দিনের বেলায়ও ঘনঘন খামারের চার পাশে খেয়াল রাখতে হবে যাতে অধিক সময় কোন ডিম পড়ে থাকার কারনে খুব বেশী ঠান্ডা বা গরম না হয়ে যায়।
২. খুব বেশী প্রয়োজন না হলে ডিমকে পানি দিয়ে ধৌত করবেননা, যদি কখনো ডিম ধৌত করার প্রয়োজন হয় তাহলে স্যাঁতসেঁতে কাপড় ব্যবহার করতে হবে।পাশাপাশি লক্ষ্য রাখতে হবে যে পানিতে কাপড়টা ভিজানো হবে তা যেন ডিমের চেয়ে গরম হয়। এই পদ্ধতিতে ডিমের ময়লাটা ঘাম হয়ে ঝড়ে পরবে। কিন্তু কোন ভাবেই এমন পানি ব্যবহার করা যাবেনা যাহা ডিম থেকে ঠান্ডা হয়। ডিমকে পানি শোষন করানো যাবেনা, যদি ডিম পানি শোষন করে কিছু সময় পর্যন্ত তাহলে ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্র সমকক্ষ হতে পারে এবং জীবানু ডিমের ভিতরে ঢুকার একটা বড় সম্ভাবনা থাকে। সংরক্ষন করার সময় ডিম শুকনো কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে, কখনো ডিমকে ভেজা কাপড়ে বা ভেজা অবস্থায় রাখা যাবে না।
৩. উর্বর ডিমকে এমন জায়গায় সংরক্ষন করতে হবে যেখানের তাপমাত্রা ১৩-১৬ ডিগ্রী আদর্শ বলে বিবেচিত হবে এবং ১৬-২৪ ডিগ্রী তাপমাতায় সাধারন ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব কিন্তু আদর্শ তাপমাত্রা বলে বিবেচিত হবে না, সেই সাথে হিউমিডিটি হবে ৭০-৭৫%. ২৪ ডিগ্রীর উপরে তাপমাত্রা এবং ৪০% এর নিচে হিউমিডিটি হবে এমন জায়গায় ডিম রাখা যাবে না। এমন অবস্থায় ডিমের হ্যাচিং রেট অতি তাড়াতাড়ি কমে আসবে। উর্বর ডিম সংরক্ষন করার পর প্রতিদিন ডিম গুলিকে হেলিয়ে বা উল্টিয়ে দিতে হবে। ডিম সংরক্ষনের সময় ডিমের শরু বা সুচালো অংশ নিচে এবং ৩০-৪৫ ডিগ্রী ডিমকে হেলিয়ে রাখতে হবে।ডিম সংরক্ষনের কার্টুন বা কন্টেইনারে প্রতি ডিমের জন্য ২"X৪" জায়গা রাখতে হবে এবং প্রতিদিন নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ডিমের পার্শ পরিবর্তন করতে হবে। কোন ভাবেই ডিমকে ১০-১৪ দিনের বেশী সংরক্ষন করবেন না। মনে রাখতে হবে যে ১৪ দিনের পর থেকেই ডিমের হ্যাচিং রেট উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করে।
৪.ডিমকে ইনকিউবেটরে বসানোর আগে ডিম গুলিকে রুমের সমান তাপমাত্রায় আসার আগ পর্যন্ত রেখে দিতে হবে। ফাটা বা ভাঙ্গা ডিমকে সরিয়ে ফেলতে হবে।


কৃত্রিমভাবে ডিম ফোটানোর চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ
১/ তপামাত্রা
২/ আদ্রতা
৩/ বায়ূ চলাচল
৪/ ঘূর্ণন
এই সকল বিষয়ের মাঝে তাপমাত্রা হল সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। তবে এখানে অধিকাংশ সময় আদ্রতার তত্ত্বাবধায়ন উপেক্ষিত হওয়ার কারনে হ্যাচিংয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ব্যাপক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, সর্বোত্তম ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা হল ৩৭.৭৭ ডিগ্রী যেখানে তার সাথে আদ্রতা হবে ৬০%। লক্ষ্য রাখতে হবে অক্সিজেন যেন অবশ্যই ২০% হয়। কার্বনডাইঅক্সাইড অবশ্যই ০.৫% হতে হবে। ইনকিউবেটর এর তাপমাত্রা অবশ্যই ৩৭.২২- ৩৭.৫ ডিগ্রী এবং আদ্রতা ৬০-৬৫% সেট করতে হবে।
১। "তাপমাত্রা"
Incubator এ ডিম গরম করার সময় কালীন ৩৭.২২-৩৭.৭৭ সেট করতে হবে। সঠিক নির্ভরযোগ্য তাপমাত্রা এবং আদ্রতা জানার জন্য থার্মোমিটার কে সমান ভাবে ডিম থেকে উপরে এবং তাপের উৎস থেকে দূরে রাখতে হবে। সঠিক রিডিং নিশ্চিত করতে দুইটা থার্মোমিটার ব্যবহার করাই হল উত্তম। অবশ্যই মেশিনের বাইরের তাপমাত্রা সহনীয় হতে হবে। ইনকিউবেটরে তাপমাত্রা অবশ্যই ৩৭.২২ - ৩৭.৭৭ এর মাঝে রাখতে হবে। গ্রহনযোগ্য মাত্রা হল ৩৬.১১- ৩৮.৩৩ ডিগ্রী। 

ভ্রুন মৃত্যুর হার পরিলক্ষিত হবে যদি তাপমাত্রা ৩৫.৫৫ ডিগ্রীর নিচে এবং ৩৯.৪৪ ডিগ্রীর উপরে চলে আসে কয়েক ঘন্টার জন্য। যদি তাপমাত্রা কয়েক দিনের জন্য চরম পর্যায়ে অবস্থান করে তখন ডিম না ফুটার সম্ভাবনাই বেশী থাকে। অতি তাপমাত্রা অনেক বেশী সংকটপূর্ণ হয় কম তাপমাত্রা থেকে। ইনকিউবেটর যদি ৪০.৫৫ ডিগ্রী তাপমাত্রায় ১৫ মিনিট চলে তাহলে ভ্রুন মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেখানে মেশিন ৩৫ ডিগ্রী তাপমাত্রায় যদি ৩-৪ ঘন্টাও চলে তাহলে শুধু ডিম ফুটার ক্ষেত্রে কিছুটা বিলম্বিত হবে। টার্কির ক্ষেত্রে ২৮ দিনের জায়গায় ৩১ দিন লাগতে পারে। ইনকিউবেটর অবশ্যই এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে সূর্যের আলো সরাসরি না আসে।

 উর্বর ডিম বসানোর আগে ইনকিউবেটর কে কয়েক ঘন্টার জন্য পানির সহিত চালাতে হবে ভিতরগত বায়ূ কে স্থির করার জন্য। ডিম বসানোর ৪৮ ঘন্টার ভিতর তাপমাত্রাকে উর্ধ্বাভিমূখী করা যাবেনা। এর ফলে ডিম সিদ্ধ হয়ে যায়। উন্নত ইনকিউবেটরে অতিরিক্ত তাপমাত্রা কন্ট্রলার থাকে যা ডিমকে সিদ্ধ হতে দেয় না। ডিমগুলি ইনকিউবেটরের সমান তাপমাত্রায় গরম হতে কিছু সময়ের প্রয়োজন হয় এবং অনেক সময় ছোট মেশিনের ক্ষেত্রে ইবকিউবেটরের তাপমাত্রা ৩৬.৬৬ এর নিচে চলে আসে প্রথম ৬-৮ ঘন্টার জন্য যতক্ষন পর্যন্ত ডিম গুলি ৩৭.২২-৩৭.৭৭ ডিগ্রী গরম না হয়। যদি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্ভাবনা থাকে তাহলে হ্যাচিং কে বর্জন করা যাবেনা। এখানে অধিকাংশ সময়ই হ্যাচিং সংরক্ষিত থাকে। এখানে মূল বিষয় হল যতক্ষন সম্ভব ডিমকে গরম রাখতে হবে পাওয়ার আসার আগ পর্যন্ত।এটা হতে পারে পিচবোর্ড বক্স বা কম্বল দ্বারা ছোট ইনকিউবেটর কে ঢেকে দেওয়া অতিরিক্ত অন্তরনের জন্য। ডিমকে গরম করতে একটি বয়ামে মোমবাতি স্থাপন করে তাতে আলো দিতে হবে এবং উক্ত বয়ামকে বক্সের নিচে রেখে দিতে হবে যে বক্স দ্বারা ইনকিউবেটর কে ঢেকে রাখা হয়েছে।তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন কোন ধরনের জালানি মোমবাতির কাছে না থাকে।আর এই পদ্ধতির দ্বারা ডিমকে ৩২.২২ ডিগ্রী এর উপরে গরম রাখা যাবে অতি সহজে পাওয়ার আসার আগ পর্যন্ত।
৩২.২২ ডিগ্রী তাপমাত্রার নিচে আসার পরও ভ্রুন ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে, তাই অবশ্য আপনি ডিম গুলিকে ইনকিউবেটরের ভিতরে রাখবেন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর। অতপর ৪-৬ দিন পরে মোমবাতি পরীক্ষা করতে হবে পরবর্তি উন্নতি তথা ডিমে প্রানের চিহ্ন এসেছে কিনা তা জানার জন্য। যদি ৬ দিন পরেও আপনি কোন ডিমের মাঝে কোন প্রকার উন্নতি তথা প্রানের সন্ধান না পান তাহলে আপনি ইনকিউবেশন বাতিল করে দিবেন।অনেক সময় পাওয়ার বিভ্রাটের কারনে হ্যাচিংয়ে কিছুদিন দেরী হতে পারে এবং হ্যাচিং রেট ৪০-৫০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
২য় পর্বের প্রথম অংশে তাপমাত্রা সংক্রান্ত আলোচলা করা হয়েছিল কিন্তু পাঠকদের বিশেষ অনুরোধে আরো কিছু তথ্য এখানে তুলে ধরছি। শুরু থেকেই ইনকিউবেটর এর নিখুঁত তাপমাত্রা ৩৭-৩৮ ডিগ্রি মেনে চলা হচ্ছে এবং এই তাপমাত্রা মূল্যায়ণ করা হয়েছে আবহাওয়ার ও পরিবেশের উপর। ভ্রুণের তাপমাত্রা ও ভ্রুণ উন্নয়ন কালীন সময়ে ইনকিউবেটরের বাতাসের তাপমাত্রার সহিত মিল নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে শেষের ২য় এবং ৩য় দিন। Incubation এর সময় সফল এবং বানিজ্যিক পোল্ট্রি Incubation এর জন্য পরিক্ষিত তাপমাত্রার দিকে লক্ষ্য রাখা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জীববিজ্ঞানের নিয়মে যাকে ঘনঘন পরীক্ষা করা খুব জরুরি। অতি মাত্রায় তাপমাত্রার কারনে ভ্রুণের যেসব ক্ষতি হতে পারে তা নিচের দুটি ছবি (নাম্বার ১ এবং ২) দিয়ে বোঝানো হলো। পাশাপাশি Incubation এর সময় অতি মাত্রায় তাপমাত্রার কারনে ভ্রুণের যে ক্ষতি হতে পারে তা নিম্নরুপঃ
১/ ব্রেইন প্রকাশিত হওয়া।
২/ পা পরিবর্তন হওয়া
৩/ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাঝে অপ্রতিসাম্য হওয়া।যেমন পায়ের আঙ্গুল বাঁকা হওয়া ইত্যাদি।
৪/ ডিমের কসুমের মাত্রা বডি থেকে কমিয়ে ফেলা।
৫/ হৃদপিন্ডের আকার ছোট হওয়া।
৬/ লাল বন্ধকী থেঁতে যাওয়া।
৭/ ডিমের কসুম বিস্ফারিত হওয়া।
৮/ নাভিকে অসুস্থ করা।
৯/ ভ্রুণের বিলম্ব মৃত্যু বৃদ্ধিকরা।
১০/ পালক সাদা হওয়া।
এই সকল সমস্যা থেকে রেহায় পেতে সেই সব ইনকিউবেটর ব্যবহার করুন যাদের কন্ট্রোলারে "ওভার টেম্পারেচার কন্ট্রোলার" সয়ংক্রীয়ভাবে কাজ করে।
ডিমের খোসার তাপমাত্রা নির্নয়ঃ
অতি সাধারন ভাবে ডিমের খোসার তাপমাত্রা পরীক্ষা করার পদ্ধতি প্রথমত ১০ টা ডিম ইনকিউবেটরের ভিন্ন ভিন্ন জায়গা হতে নির্ধারন করতে হবে।অতপর Infrared Thermometer কে air cell এর শেষের দিকে নিচে ধরতে হবে। তাহলেই খোসার তাপমাত্রা জানা যাবে। ( ছবি নাম্বার ৩ এ দেখানো হচ্ছে) বিঃদ্রঃ মনে রাখতে হবে এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মৃত ভ্রুণ গুলি সাধারনত রিডিং কম দেখাবে। Incubation period এর শেষের দিকে ডিমের খোসার তাপমাত্রার লক্ষ্যমাত্রা হবে ৩৭.৪- ৩৭.৮ ডিগ্রি Incubation এর ৬-১৩ দিনের সময় কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারন এ সময়ে Internal এবং external উভয় পরীক্ষায় দেখা যায় যে ভ্রণের এ স্তরের উন্নয়নে অতি তাপমাত্রার বেশী সামর্থ রাখে। এছাড়াও যদি কম সংখক ডিম ইনকিউবেটরে বসানো হয় তাহলে উত্তম তথা সঠিক পদ্ধতি হল সব গুলি ডিমকে নমুনা স্বরোপ পরীক্ষা করা। যদি ডিমের পরিমান ৩০০ বা তার চেয়ে বেশী হয় তাহলে অবশ্যই ১০০-২০০ ডিমকে নমুনা স্বরোপ পরীক্ষা করতে হবে। ফলাফলের নিখুঁত গুনগত মান এবং কম খরচের নিশ্চয়তা দিতে বড় হ্যাচারীর মাঝে নমুনার কার্যপ্রণালী অবশ্যই সঠিক পূর্ব পরিকল্পিত এবং পরিসংখ্যানবিদ এর সাহায্যের সহিত অথবা পোল্ট্রি স্পেশালিষ্ট দ্বারা হতে হবে। মোমবাতি পরীক্ষা এবং সঠিক গবেষনা যুক্তিযুত হতে পারে ডিমের উর্বরতার নিশ্চয়তা দিতে।
২। "আদ্রতা"
আগে জানতে হবে আদ্রতা কি? আদ্রতা হলো বাতাসে জলীয় বাষ্পের তথা পানির পরিমান। বাতাসের আদ্রতা Incubator এর ভিতর অবশ্যই ৫৫% থেকে ৬০% হতে হবে। শেষের তিন দিন তথা হ্যাচিং এর সময়ে Humidity অবশ্যই ৬৫-৭৫% এর কাছাকাছি হতে হবে। Incubator-এ অতি মাত্রায় আদ্রতা সাধারন বাষ্পীকরনের প্রতিরোধক এবং এর ফলে হ্যাচিং রেইট কমে আসে। কিন্তু ছোট Incubator-এ অতিমাত্রায় আদ্রতা কদাচিত সমস্যা তৈরি করে। অতি অল্প আদ্রতার ফলে বাচ্চা খোসার ভেতরই আটকে যায়। তাই অনেক সময় বাচ্চা খোসার ভিতরই মারা যায় এবং কোন কোন সময় বাচ্চা বিকলাঙ্গ হয়। পানির পাত্রের আকার পরিবর্তনের দ্বারা Incubator এ বাতাসের আদ্রতার বিভিন্নরুপ হতে পারে অথবা পানির পাত্রে চামচ রাখার ফলেও বৃদ্ধি পায় বাষ্পীভবনের পৃষ্ঠতল। Incubator ব্যবহার কালীন সময়ে নিয়মিত পানির পাত্রকে চেক করতে হবে যাতে সব সময় পাত্রে পর্যাপ্ত পানি থাকে।  ইনকিউবেটরে অতিরিক্ত পানির পাত্র দেয়ার ফলে আদ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে। হ্যাচিং এর সময়ে Incubator এ Atomizer / Humidity Fire ব্যবহারের দ্বারা আদ্রতা বৃদ্ধি হতে পারে। ( Atomizer হল তরল পদার্থকে সূক্ষ সূক্ষ কণায় ছড়াইবার জন্য ডাক্তারি যন্ত্র বিশেষ, যার দ্বারা বায়ু চলাচলের রাস্তায় অল্প পরিমান পানি ষ্প্রে করবে)। হাঁস এবং রাজহংসীর ডিম হ্যাচিং করার সময় এই পদ্ধতি বিশেষ ভাবে সাহায্যকারী হয়। Incubator-এ যখনই পানি দেয়া হবে তখন আপনাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন পানির তাপমাত্রা Incubator এর তাপমাত্রার সমান হয়। এই পদ্ধতিতে আপনার দ্বারা ডিম এবং ইনকিউবেটরে কোন প্রকারের জোর প্রয়োগ করা হবেনা। এর একটি ভাল পরীক্ষা হল পানিকে ষ্পর্শ করার দ্বারা গরম অনুভব হবে।
আদ্রতা পরীক্ষা করার জন্য Wet bulb থার্মোমিটার ব্যবহার একটি ভাল পদ্ধতি।
বায়ু চলাচল (Ventilation): সাভাবিক বায়ূমন্ডলের দ্বারা হ্যাচিংয়ে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। যাহা সাধারনত ২০-২১% অক্সিজেন ধারন করে। অতিমাত্রায় অক্সিজেন সর্বরাহ করা অনেক কঠিন। কিন্তু অভাব পূরন করা সম্ভব। Incubator এ বায়ু চলাচলের রাস্তা নিশ্চিত করতে হবে সাধারন বায়ু পরিবর্তনের জন্য। আর ইহা Home made ইনকিউবেটরের ক্ষেত্রে সংকটপূর্ন। তবে মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত বায়ু চলাচল এর কারনে আদ্রতা বের হয়ে যায় এবং এর ফলে Incubator সঠিক ভাবে গরম করা কঠিন হয়ে যায়।

১।ডিম নির্বাচন। ডিম দুই প্রকারের হয়ে থাকে। নিষক্ত এবং অনিষিক্ত ডিম। আমরা বাজার থেকে যে ফার্মের ডিম কিনে থাকি সেগুলো সবই অনিষিক্ত ডিম এগুলো দিয়ে বাচ্চা ফুটবে না। আর বাজারে যেসব দেশী মুরগীর ডিম পাওয়া যায় সেগুলো সাধারণত নিষক্ত ডিম হয়ে থাকে এবং এগুলো দিয়ে ইনকিউবেটরে বাচ্চা ফুটানো সম্ভব। সুতরাং ইনকিউবেটরে ডিম দেবার আগে সেগুলো নিষক্ত ডিম কিনা সেটা নিশ্চত হয়ে নিন। তা না হলে নির্দিষ্ট সময় পর পচা ডিমের গন্ধে আপনার বাড়ী ভরে যাবে।  আর ডিম সংগ্রহের পর সেগুলো রুম তাপমাত্রায় রাখুন। রেফ্রিজারেটরে রাখলে সেগুলো ইনকিউবেটরে দেবার আগে ৪-৫ ঘন্টা রুম তাপমাত্রায় রেখে স্বাভাবিক করে নিন। এক দিন বয়সী কিংবা অনেক পুরনো ডিম পরিহার করা উচিত।

২। ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা ও আদ্রতা নির্বাচন। 

৯৯.৫০  ফারেনহাইট অথবা ৩৭.৫সেলসিয়াস। এর সামান্য কমবেশী হলে ডিম দেরিতে অথবা তাড়াতাড়ি ফুটবে। যদি তাপমাত্রা খুব কম অথবা অনেক বেশী হয় তাহলে ডিম ফুটবে না।  ডিম ফূটার তিন দিন আগে পর্যন্ত আদ্রতা ৫০-৬০% রাখুন, শেষ তিন দিন আদ্রতা ৭০-৭৫% রাখতে হবে যাতে ডিমের খোলস নরম থাকে এবং খোলস ভেংগে বাচ্চা বেরিয়ে আসতে পারে।

৩।      ইনকিউবেটর প্রস্তুত করণ। ডিম দেয়ার আগে ইনকিউবেটরকে কম পক্ষে ৫-৬ ঘন্টা চালিয়ে তাপমাত্রা ৯৯.৫০  ফারেনহাইট অথবা ৩৭.৫সেলসিয়াস এ আনুন। এর মাধ্যমে ইনকিউবেটরের ছোট খাট সমস্যা থাকলে সেটাও ধরা যাবে।

৪।       কিভাবে ডিম রাখবেন

ইনকিউবেটরের ডিম রাখার সময় সরু অংশ নীচের দিকে রাখুন। ডিম রাখার সময় ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে কারন ডিমগুলো কিছু তাপমাত্রা শোষন করবে, ভেতরের বাতাস বাইরে বের হয়ে আসবে অথবা বাইরের বাতাস ভেতরে ঢুকবে। ৫-৬ ঘন্টা পরেও যদি তাপমাত্রা ৩৭.৫০ সেলসিয়াসে না পৌছে তবে ইনকিউবেটর পরীক্ষা করুন। একবার ডিম দেবার পর ৭ দিনের আগে আর খুলবেন না।  ৭-৮ দিন পর খুলে একটা একটা করে ডিম পরীক্ষা করে দেখুন যে ডিমের ভেতরের ভ্রুন তৈরী হয়েছে কিনা। যেগুলোতে ভ্রূন তৈরী হয়েছে, সেই ডিমগুলো পাশাপাশি রাখুন।

৫।       মাঝে মাঝে ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা কমে যায় কেন? যেহেতু  ইনকিউবেটরের হিটার সারাক্ষন অন অবস্থায় থাকে না তাই কিছুক্ষন পর পর ভেতরের তাপমাত্রা কমে যাবে। ভয় পাবার কিছু নেই। ইনকিউবেটর ঠিক থাকলে কিছুক্ষন পর পর হিটার অন হয়ে তাপমাত্রা ঠিক হয়ে যাবে।   এভাবেই ইনকিউবেটর তৈরী করা হয়েছে।

৬।       ভেন্টিলেশন। ভ্রূন তৈরী হবার সময়ে এবং তারপর থেকে বাচ্চা বের হওয়া পর্যন্ত ডিমেরও শ্বাস – প্রশ্বাস নিতে হয়।  ভ্রূনের জন্য বাতাসের তাজা অক্সিজেন খুব জরুরী। প্রথম দিকে কম অক্সিজেন লাগলেও ভ্রূন গুলো বড় হতে থাকলে এবং বাচ্চা বের হবার পর প্রচুর অক্সিজেন লাগে। ডিম রাখার এক সপ্তাহ পর একবার ১-২ ঘন্তার জন্য ভেন্টিলেশন উইন্ডোগুলো খুলে রাখুন যাতে তাজা বাতাস ভেতরে ঢুকতে পারে। এরপর প্রতিদিন বা ২-৩ দিন অন্তর একবার অন্তত ৫-১০ মিনিটের জন্য ভেন্টিলেশন উইন্ডোগুলো খুলে রাখুন। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে শুরু করলে, ভেন্টিলেশন উইন্ডোগুলো সব সময়ের জন্য খুলে দিন।

৭।       ডিম পরীক্ষা করুন। ডিম রাখার ৭ দিন পর একটা একটা করে ডিম নিয়ে আলোতে ধরে পরীক্ষা করুন। আমাদের দেয়া এগ ক্যান্ডল ব্যবহার করুন। যেসব ডিমে ভ্রুন তৈরী হয়নি সেগুলোতে পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়ে আলাদা এক জায়গায় আবার বসিয়ে দিন। ১৪ দিনের মাথায় আবারো শুধুমাত্র দাগ দেয়া ডিম গুলো পরীক্ষা করুন। এখনও যেসব ডিমে ভ্রুন দেখতে পাচ্ছেন না সেগুলো ফেলে দিন, বাকী গুলো আবার ইনকিউবেটরে দিয়ে দিন।  ডিম খুব বেশী নড়াচড়া কিংবা ঝাকুনী দিবেন না। এতে ভ্রুন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এসময় খুব বেশী সময় ধরে ইনকিউবেটরের দরজা খোলা রাখলে আদ্রতা কমে গিয়ে আগেরবারের ভাল ডিমগুলো ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে ভ্রুন মরে যাবে।

৮।      ডিম ঘুরানো বন্ধ করুন। দিম দেবার পর ডিমের ট্রে আপনা আপনি ঘুরতে থাকবে। এটা প্রতি দুই ঘন্টা পর একবার ঘুরবে। ডিম ফুটার তিন দিন আগে থেকে Turning Switch অফ করে দিন এবং সব ডিমকে টার্নিং ট্রে থেকে সরিয়ে হ্যাচিং ট্রেতে রাখুন। ইনকিউবেটরের আদ্রতা বাড়িয়ে দিন আর অপেক্ষা করুন। এই তিন দিন অতি ভয়াবহ জরুরী অবস্থা ছাড়া ইনকিউবেটরের দরজা খুলবেন না।

৯।       হাঁস –মুরগী-কোয়েল বা টার্কির ডিম একসাথে? না কখনো এই কাজটি করবেন না। যেহেতু একেক ডিম একেক সময়ে ফুটবে, তাই বারবার ইনকিউবেটরের দরজা খোলা – বন্ধ করতে গেলে আদ্রতা এবং তাপমাত্রা কমে গিয়ে অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যাবে। অবশ্য একটু বুদ্ধি খাটালে এটা সম্ভব। হাঁসের ডিম ২৮ দিন, মুরগী ২১ আর কোয়েলের ডিম ১৮ দিনে ফুটে।  যদি সব ধরনের ডিম একসাথে দিতে চান,  তাহলে প্রথমে হাঁসের ডিম দিন। এর ৭ দিন পর ডিম পরীক্ষার সময় মুরগীর ডিম দিন। তার তিন দিন পর দিন কোয়েলের ডিম রাখুন। এতে করে হাঁস – মুরগী আর কোয়েলের বাচ্চা একই সময়ে ফুটবে। তবে এতেও কিছু  হাঁসের ডিম নষ্ট হতে পারে।

১০।     নির্দিষ্ট দিনেও ডিম ফুটেনি? ঘাবড়াবেন না। অনেক কারনেই ডিম দেরীতে ফুটতে পারে। তাই ১৮, ২১ বা ২৮ দিনে ডিম না ফুটলে আরো ২ দিন অপেক্ষা করুন। এরপরও না ফুটলে কয়েকটা ডিম ভেংগে পরীক্ষা করে দেখুন ভেতরের অবস্থা কি। তারপর চাইলে আরো সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টা অপেক্ষা করুন অথবা না ফোটা ডিম ফেলে দিন। প্রথম প্রথম ইনকিউবেটর ব্যবহারের অনভিজ্ঞতার কারনে কিছু ডিম নষ্ট হতে পারে। আস্তে আস্তে দুই একটি ব্যাচ করার পর আপনার অভিজ্ঞতা আপনাকে অনেক সাহায্য করবে।

১১।     বাচ্চা ফুটছে – কি করবেন? অভিনন্দন আপনাকে। Congratulations. ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে সেগুলো শুকিয়ে ঝরঝরে হতে দিন। তারপর ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কিচির মিচির করবে। এরপর তাদেরকে উষ্ণ ব্রুডারে রাখুন। খাবার, পানি দিন। ব্রুডার গরম রাখুন। মনে রাখবেন ডিম ফোটার পর ২৪ -৩০ ঘন্টা পর্যন্ত বাচ্চার কোন খাবার বা পানির দরকার নেই। ডিম ভেংগে বাচ্চার ঠোট বের করে উকি দেয়ার ২৪-৪৮ ঘন্টা পর বাচ্চা বের হয়। সব কিছু ঠিক থাকলে বাচ্চারা নিজের খোলস নিজেই ভেংগে বের হবে কোন বাইরের সাহায্য দরকার নেই।  কিছু বাচ্চা হয়তো ডিমের খোলস ভেংগে বের হতে পারছে না। তাদেরকে প্রকৃতির উপর সমর্পন করুন অথবা ৪৮ ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়ে গেলে আলতো হাতে খোলাস ভেংগে বের করে আনুন। ভাগ্য ভাল হলে সেগুলো বেঁচে যেতে পারে।

১২।     বাচ্চার খাবার। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানীর খাবার কিনতে পাওয়া যায়। এক দিন বয়সী বাচ্চার জন্য উপযোগী খাবার কিনলেও প্রথম ৮-১০ দিন সেগুলোকে পাটায় পিষে কিংবা ব্লেন্ডারে একটু গুড়ো করে দিন। ব্রয়লারের বাচ্চার জন্য বানিজ্যিক খাবার উপযোগী হলেও আমাদের দেশীইয় মুরগী কিংবা কোয়েলের জন্য এগুলোর আকার বা ( Size) অনেক বড় হয়ে যায়। তাই প্রথম দিকে ভেংগে দিতে হয়।

১৩।     পানি। বাচ্চাকে অতি ঠান্ডা কিংবা অতি গরম পানি দেবেন না। কুসুম গরম পানি সবচে ভাল। প্রতিদিন পানির ট্রে ধুয়ে পরিস্কার করুন। ফোটানো পানি দিন।

১৪।     কতিপয় সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার।

ক।      নির্দিষ্ট দিনের আগেই বাচ্চা ফুটে গেছে। তাপমাত্রা অনবরত ৩৭.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশী থাকলে কিংবা ডিম ইনকিউবেটরে রাখার আগে থেকেই ঐ তাপমাত্রায় রাখা হলে ডিম আগে ফুটে যেতে পারে।  ইনকিউবেটরে ডিম দেয়ার আগে ডিম যেন ২০-২৫০  ডিগ্রীর বেশী তাপমাত্রাইয় রাখা না হয় সেটা নিশ্চত করুন।

খ।       নির্দিষ্ট দিনের পরে বাচ্চা ফুটেছে। তাপমাত্রা অনবরত ৩৭.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কম থাকলে এটা হতে পারে।

গ।       পরিপূর্ন ভ্রুন, ঠোট বের করেছে কিন্তু মারা যাচ্ছে। নিম্ন আদ্রতা এবং  কম ভেন্টিলেশনের কারনে অথবা ডিমের নীচু দিক উপর করে ট্রে তে রাখলে এটা হতে পারে।(ডিমের মোটা অংশ উপর ডিকে থাকবে)।

ঘ।       পরিপূর্ন ভ্রুন, ঠোট বের করতে পারেনি এবং মারা যাচ্ছে। অতি বেশী আদ্রতা, কম ভেন্টিলেশনের কারনে অথবা ডিমের নীচু দিক উপর করে ট্রে তে রাখলে এটা হতে পারে।(ডিমের মোটা অংশ উপর ডিকে থাকবে)। এছাড়া ভ্রুন তৈরী হবার সময়ে ডিমের ট্রে অনেকক্ষন না ঘুরে এক পজিশনে থাকলেও এটা হতে পারে।

ঙ।       বাচ্চা বের হয়েছে, কিন্তু নাভী উম্মুক্ত এবং রক্তক্ষরণ। অতিরিক্ত তাপমাত্রা।

চ।       ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার সময়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। সাধারণত ৮০-৯০% ডিম একই দিনে ৪-৫ ঘন্টার ব্যবধানে ফুটবে। বাকী ডিম পরবর্তী ৭-৮ ঘন্টা আগে অথবা পরে ফুটবে। যদি এমন দেখা যায় যে  কিছু ডিম এখন, কিছু ডিম একদিন পর, কিছু ডিম ২ দিন পর ফুটেছে, তাহলে বুঝতে হবে যে, ইনকিউবেটরের ভেতরে কিছু জায়গায় গরম কিছু জায়গায় ঠান্ডা আবহাওয়া রয়েছে। যেসব জায়গা গরম সেগুলোর ডিম আগে ফুটে যাচ্ছে আর যেসব জায়গা ঠান্ডা, সেসবের ডিম পরে ফুটছে।

ছ।       বাচ্চা খোলসের সাথে আটকে যাচ্ছে।         অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং নিম্ন আদ্রতা অথবা বার বার ইনকিউবেটরের দরজা খোলা হলে এমনটা হতে পারে।

জ।      বিকলাংগ বাচ্চা। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কিছু বাচ্চা বিকলাংগ হতেই পারে যার পরিমান সংখ্যায় ১-২% এর বেশী হবার কথা নয়। যদি এর থেকে বেশী হয় তাহলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নিম্ন আদ্রতা অথবা ডিম উলটা করে রাখার ফলে এমনটা হয়েছে।

ঝ।      দুর্বল বাচ্চা।   প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কিছু বাচ্চা দুর্বল হতেই পারে যার পরিমান সংখ্যায় ১-২% এর বেশী হবার কথা নয়। যদি এর থেকে বেশী হয় তাহলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নিম্ন আদ্রতা অথবা ডিম উলটা করে রাখার ফলে এমনটা হয়েছে।

ঞ।     ভ্রুনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কিন্তু বাচ্চা ফোটেনি।  ডিম ঠিক মত উলটানো হয়নি, তাপমাত্রা সঠিক ছিল না, খারাপ ভেন্টিলেশন, রোগ বালাই কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকলে এটা হতে পারে।

ট।       সামান্য ভ্রুনের গঠন, তারপর মারা গেছে।  ব্যাকটেরিয়া সংক্রমন, ইনকিউবেটরে দেবার আগে অতি ঠান্ডা কিংবা অতি গরম তাপমাত্রায় ডিম সংরক্ষন, অপরিচ্ছন হাত, অপরিচ্ছন্ন ইনকিউবেটর, ইনকিউবেটরের আভ্যন্তরীন তাপমাত্রা হঠাত কম বেশী হলে কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকলে এটা হতে পারে।

ঠ।       ভ্রুন গঠিত হয় নি। অনিষিক্ত ডিম, ইনকিউবেটরে বসানোর আগে অতিরিক্ত নড়াচড়ার ফলে ডিমের  ভেতরে কুসুম ভেংগে যাওয়া কিংবা অনেক দূর থেকে ডিম আনার পর যথাযথ রেষ্ট না দিয়ে ইনকিউবেটরে ডিম বসালে এটা হতে পারে।

পোলট্রি শিল্পে সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্তঃ টার্কী

টার্কি (Turkey) মেলিয়াগ্রিডিডিই পরিবারের এক ধরনের বড় আকৃতির পাখি বিশেষ। এগুলো দেখতে মুরগির বাচ্চার মতো হলেও তুলনামূলকভাবে অনেক বড়। বিশ্বের সর্বত্র টার্কি গৃহপালিত পাখিরূপে লালন-পালন করা হয়। এরা পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। পালনের জন্য উন্নত অবকাঠামো দরকার হয় না । এরা প্রতিদিন মোট খাদ্যের ৫০-৬০ ভাগ নরম ঘাস খায়। তাই খাবার খরচ কম। রোগবালাই (বার্ড ফ্লু, গুটি বসন্ত, ঠাণ্ডাজনিত রোগ ছাড়া এখন পর্যন্ত এদের অন্য কোনো রোগ পরিলক্ষিত হয়নি) কম বলে চিকিৎসা খরচ কম। মাংস উৎপাদনের দিক থেকে খুবই ভালো (৬ মাস বয়সে ৫-৬ কেজি)। পাখির মাংস হিসেবে এটা মজাদার এবং কম চর্বিযুক্ত। তাই গরু বা খাসির মাংসের বিকল্প হতে পারে। আমাদের দেশে অনেকের ব্রয়লার মুরগির মাংসের ওপর অনীহা আছে। তাদের জন্য এটা হতে পারে প্রিয় খাবার। প্রোটিনের নতুন আরেকটি উৎস হিসেবে টার্কি হতে পারে বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত।


টার্কি পাখি পরিচিতি : আমাদের দেশের অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশে পশুপাখি পালন অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ। আবার কিছু প্রাণী আছে যারা দ্রুত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। আর টার্কি পাখি সে রকম একটি সহনশীল জাত, যে কোনো পরিবেশ দ্রুত এরা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। এরা বেশ নিরীহ ধরনের পাখি, মুক্ত অথবা খাঁচা উভয় পদ্বতিতে পালন করা যায়। ৬-৭ মাস বয়স থেকে ডিম দেয়া শুরু করে এবং বছরে ২-৩ বার ১০-১২টি করে ডিম দেয়। একটি মেয়ে টার্কির ৫-৬ কেজি এবং পুরুষ টার্কি ৮-১০ কেজি ওজন হয়। এদের মাংস উৎকৃষ্ট স্বাদের। ঘাস, পোকামাকড়, সাধারণ খাবার খেতে এরা অভ্যস্ত, তবে উন্নত খাবার দিলে ডিম ও মাংসের পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। ৪-৫ মাস বয়সের টার্কি ক্রয় করা ভালো, এতে ঝুঁকি কম থাকে এবং লিঙ্গ নির্ধারণ সহজ হয়, এরকম বয়সের এক জোড়া টার্কিও দাম হবে প্রায় ৪৫০০-৫০০০ টাকা। প্রথমে বাণিজ্যিকভাবে শুরু না করে ৮-১০ জোড়া দিয়ে শুরু করা ভালো, কারণ তাতে সুবিধা অসুবিধাগুলো নির্ণয় করা সহজ হয়।

রোগবালাই : টার্কি পাখির তেমন বড় কোনো রোগবালাই নেই। চিকেন পক্সের টিকা নিয়মিত দিলে এ রোগ এড়ানো সম্ভব। অতি বৃষ্টি বা বেশি শীতের সময় মাঝে মাঝে ঠা-াজনিত রোগ দেখা যায়, রেনামাইসিন জাতীয় ওষুধ দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে নিয়োমিত টিকা দিলে এসব রোগ থেকে সহজেই টার্কিকে রক্ষা করা যায়।

টিকাপ্রদান সূচি : 
এক দিন বয়স- এনডি-বি১ স্ট্রেইন
৪র্থ ও ৫ম সপ্তাহ- ফাউল পক্স 
৬ষ্ঠ সপ্তাহ - এনডি-(আর২বি)
৮-১০ সপ্তাহ - কলেরা ভ্যাকসিন


টার্কি পালনের সুবিধা
• এদের মাংস উৎপাদন ক্ষমতা অনেক, টার্কি ব্রয়লার মুরগির থেকে দ্রুত বাড়ে;
• ঝামেলাহীনভাবে দেশি মুরগির মতো পালন করা যায়; অল্প পুঁজিতে একটি আদর্শ টার্কির খামার করা যায়;
• টার্কি পালনে তুলনামূলক খরচ কম, দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি ঘাস, লতা-পাতা খেতেও পছন্দ করে;
• টার্কি দেখতে সুন্দর, তাই বাড়ির শোভাবর্ধন করে;
• টার্কির মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি, চর্বি কম। তাই গরু কিংবা খাসির মাংসের বিকল্প হতে পারে;
• টার্কির মাংসে অধিক পরিমাণ জিংক, লৌহ, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন ই ও ফসফরাস থাকে। এ উপাদানগুলো মানব শরীরের জন্য উপকারী এবং নিয়মিত এ মাংস খেলে কোলেস্টেরল কমে যায়;
• টার্কির মাংসে এমাইনো এসিড ও ট্রিপটোফেন অধিক পরিমাণে থাকায় এর মাংস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়;
• অন্যান্য পাখির তুলনায় রোগবালাই কম এবং কিছু নিয়ম মেনে চললে খামারে ঝুঁকি অনেক কমে যায়;
• উচ্চমূল্য থাকায় খরচের তুলনায় আয় অনেক বেশি।


পালন পদ্ধতি : দুইভাবে টার্কি পালন করা যায়- ০১. মুক্ত চারণ পালন পদ্ধতি ও ০২. নিবিড় পালন পদ্ধতি

মুক্ত চারণ পালন পদ্ধতি
মুক্ত চারণ পদ্ধতিতে এক একর ঘেরা জমিতে ২০০-২৫০টি পূর্ণ বয়স্ক টার্কি পালন করা যায়। রাতে পাখিপ্রতি ৩-৪ বর্গফুট হারে জায়গা লাগে। চরে খাওয়ার সময় তাদের শিকারি জীবজন্তুর হাত থেকে বাঁচাতে হবে। ছায়া ও শীতল পরিবেশ জোগানর জন্য খামারে গাছ রোপণ করতে হবে। চারণভূমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করতে হবে এতে পরজীবীর সংক্রমণ কম হয়। সুবিধা : খাবারের খরচ ৫০ শতাংশ কম হয়; স্বল্প বিনিয়োগ : খরচের তুলনায় লাভের হার বেশি।
মুক্ত চারণ ব্যবস্থায় খাবার : টার্কি খুব ভালোভাবে আবর্জনা খুঁটে খায় বলে এরা কেঁচো, ছোট পোকামাকড়, শামুক, রান্নাঘরের বর্জ্য ও উঁইপোকা খেতে পারে, যাতে প্রচুর প্রোটিন আছে ও যা খাবারের খরচকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এছাড়া শিম জাতীয় পশুখাদ্য যেমন লুসার্ন, ডেসম্যান্থাস, স্টাইলো এসব খাওয়ানো যায়। চরে বেড়ানো পাখিদের পায়ের দুর্বলতা ও খোঁড়া হওয়া আটকাতে খাবারে ঝিনুকের খোলা মিশিয়ে সপ্তাহে ২৫০ গ্রাম হিসাবে ক্যালসিয়াম দিতে হবে। খাবারের খরচ কম করার জন্য শাকসবজির বর্জ্য অংশ দিয়ে খাবারের ১০ শতাংশ পরিমাণ পূরণ করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য রক্ষা : মুক্তচারণ ব্যবস্থায় পালিত টার্কির অভ্যন্তরীণ (গোল কৃমি) ও বাহ্য (ফাউল মাইট) পরজীবী সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে। তাই পাখিদের ভালো বিকাশের জন্য মাসে একবার ডিওয়ার্মিং ও ডিপিং করা আবশ্যক।

নিবিড় পালন পদ্ধতি : বাসস্থান টার্কিদের রোদ, বৃষ্টি, হাওয়া, শিকারি জীবজন্তু থেকে বাঁচায় ও আরাম জোগায়। অপেক্ষাকৃত গরম অঞ্চলগুলোতে খামার করলে ঘরগুলো লম্বালম্বি পূর্ব থেকে পশ্চিমে রাখতে হবে। খোলা ঘরের প্রস্থ ৯ মিটারের বেশি হওয়া চলবে না। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ঘরের উচ্চতা ২.৬ থেকে ৩.৩ মিটারের মধ্যে থাকতে হবে। বৃষ্টির ছাঁট আটকাতে ঘরের চালা এক মিটার বাড়িয়ে রাখতে হবে। ঘরের মেঝে সস্তা, টেকসই, নিরাপদ ও আর্দ্রতারোধক বস্তু যেমন কংক্রিটের হওয়া বাঞ্ছনীয়। কম বয়সি এবং প্রাপ্ত বয়স্ক পাখির ঘরের মধ্যে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং পাশাপাশি দুটি ঘরের মধ্যে অন্তত ২০ মিটার দূরত্ব থাকতে হবে। ডিপ লিটার পদ্ধতিতে টার্কি পালনের সাধারণ পরিচালনা ব্যবস্থা মুরগি পালনেরই মতো, তবে বড় আকারের পাখিটির জন্য যথাযথ বসবাস, ওয়াটারার ও ফিডারের জায়গার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সুবিধা : উন্নত উৎপাদন দক্ষতা; উন্নততর পরিচালন ও ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ।
নিবিড় পালন ব্যবস্থায় খাদ্য : নিবিড় পালন ব্যবস্থায় টার্কি মুরগিকে ম্যাশ ও পেলেট (ট্যাবলেট) দুইভাবেই খাবার দিতে হবে। মুরগির তুলনায় টার্কির শক্তি, প্রোটিন ও খনিজের প্রয়োজন বেশি। সেজন্য টার্কির খাবারে এগুলোর আধিক্য থাকতে হবে। খাবার মাটিতে না দিয়ে ফিডারে দিতে হবে। যেহেতু পুরুষ ও মাদির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শক্তির (এনার্জি) পরিমাণ আলাদা, তাই ভালো ফল পাওয়ার জন্য তাদের পৃথকভাবে পালন করতে হবে। টার্কিদের সব সময় অবিরাম পরিষ্কার পানির প্রয়োজন। গ্রীষ্মকালে ওয়াটারারের সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে হবে এবং আপেক্ষতৃক ঠাণ্ডা সময়ে খাবার দিতে হবে। পায়ের দুর্বলতা এড়াতে দিনে ৩০-৪০ গ্রাম হারে ঝিনুকের খোসার গুঁড়া দিতে হবে এবং খাবারে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে তা আস্তে আস্তে করতে হবে।

সবুজ খাদ্য : নিবিড় পদ্ধতিতে ড্রাই ম্যাশ হিসাবে মোট খাদ্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সবুজ খাবার দেয়া যায়। সব বয়সের টার্কির জন্য টাটকা লুসার্ন প্রথম শ্রেণীর সবুজ খাদ্য। এছাড়া খাবারের খরচ কম করার জন্য ডেসম্যান্থাস ও স্টাইলো কুচি করে টার্কিদের খাওয়ান যেতে পার।বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টার্কি মুরগি পালন দিনে দিনে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। টার্কি বাণিজ্যিক মাংস উৎপাদনের জন্য খুবই উপযুক্ত কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে ডিম উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত নয়। তারা দেখতে খুব সুন্দর হয় এবং আপনার বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে করতে সাহায্য করে। টার্কি মুরগি দ্রুত বড় হয়ে যায় এবং ব্রয়লার মুরগির মতো খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের আবহাওয়া অন্যান্য পরিস্থিতিতে টার্কি মুরগি পালনের জন্য খুবই উপযুক্ত। এগুলোর পালন মুরগির মতো খুব সহজ। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টার্কি পালন-ব্যবসা করে ভালো মুনাফা অর্জনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। একটুখানি সচেতনতা, সরকারি গবেষণা এবং ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক অংশগ্রহণে এ টার্কিই হয়ে উঠতে পারে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম এমনকি ব্যপক উৎপাদনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উপায়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ মাস্টারপাড়া গ্রামের মোঃ সাজেদুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন একটি বাণিজ্যিক টার্কি মুরগির খামার। টার্কি সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তিগণ খামারটি পরিদর্শন করতে পারেন এবং টার্কি খামার স্থাপনসহ যাবতীয় পরামর্শ ও তথ্য সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নিতে পারেন অথবা নীচের নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
সাজেদুল ইসলাম, প্রোপাইটর, সফল টার্কী ফার্ম এন্ড হেচারী, ০১৭১৮৫৪২০০৬, ০১৯২৫৮৬৯৭২১