Followers

Saturday, February 23, 2019

গরু মোটাতাজাকরণ প্রযুক্তি

বাংলাদেশে গরুর মাংস খুব জনপ্রিয় এবং চাহিদাও প্রচুর। তাছাড়া মুসলমাদের ধমীয় উৎসব কুরবানীর সময় অনেক গরু জবাই করা হয়। সূতরাং “ গরু মোটাতাজাকরন” পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ন এবং

একটি লাভজনক ব্যবসা।

গরু মোটাতাজাকরন প্রক্রিয়ায় ধারাবহিক ভাবে যে সকল বিষয়গুলো সম্পন্ন করতে হব তা নিম্নরুপ।

পশু নির্বাচন

কৃমি মুক্ত করন ও টিকা প্রদান

পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং

বাজারজাত করন

০১. পশু নির্বাচন : মোটাতাজাকরণ  কর্মসূচীর জন্য গরু ক্রয়ের সময় প্রধান দুটি বিবেচ্য বিষয় হলো বয়স ও শারীরিক গঠন।

ক. বয়স নির্ধারন: মোটতাজা করার জন্য সাধারনত ২ থেকে ৫ বছরের গরু ক্রয় করা যেতে পারে, তবে ৩ বছরের গরু হলে ভাল।

খ. শারীরিক গঠন : মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত গরুর দৈহিক গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মনে রেখে গরু নির্বাচন করা জরুরী।

•    দেহ হবে বর্গাকার ।
•    গায়ের চামড়া হবে ঢিলা ( দুই আঙ্গুল দিয়ে

     ধরে টান দিয়ে দেখতে হবে)।
•    শরীরের হাড়গুলো আনুপাতিকহারে মোটা,

     মাথাটা চওড়া, ঘাড় চওড়া এবং খাটো।
•    পাগুলো খাটো এবং সোজাসুজিভাবে

    শরীরের সাথে যুক্ত।
•    পিছনের অংশ ও পিঠ চওড়া এবং লোম

    খাটো ও মিলানো ।
•    গরু অপুষ্ট ও দূর্বল কিন্তু রোগা নয়।

০২. কৃমি মুক্তকরন  : পশু ডাক্তারের নির্দেশনা মত কৃমির ঔষধ ব্যবহার করতে হবে। গরু সংগ্রহের পর পরই পালের সব গরুকে একসাথে কৃমিমুক্ত করা উচিত। তবে প্রতি ৭৫ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১ টি করে এনডেক্স বা এন্টিওয়ার্ম টাবলেট ব্যবহার  করা যেতে পারে।

০৩. টিকা প্রদান : পূর্ব থেকে টিকা না দেওয়া থাকলে খামারে আনার পরপরই সবগুলো গরুকে তড়কা, বাদলা এবং ক্ষুরা রোগের টিকা দিতে হবে। এ ব্যপারে নিকটস্থ পশু হাসপাতলে যোগাযোগ করতে হবে।

০৪. ঘর তৈরী ও আবসন ব্যবস্থাপনাঃ  আমদের দেশের অধিকাংশ খামারী ২/৩ টি পশু মোটাতাজা করে থাকে, যার জন্য সাধারনত আধুনিক সেড করার প্রয়োজন পড়েনা। তবে যে ধরনের ঘরেই গরু রাখা হোক ঘরের মধ্যে পর্যন্ত আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ঘরের মল- মূত্র ও অন্যান্য আবর্জনা যাতে সহজেই পরিস্কার করা যায় সে দিকে খেয়াল রেখে ঘরে তৈরী করতে হবে।

০৫. পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ গরু মোটতাজাকরনে দুই ধরনের খাদ্যের সমন্বয়ে রশদ (রেশন) তৈরী করা হ হয়।

•   আঁশ জাতীয়ঃ শুধু খড়, ইউ এম, সবুজ ঘাস ইত্যাদি । তবে এই প্রক্রিয়ায় খামারীদেরকে শুধু খড়ে পরিবর্তে ইউ এম এস খাওয়াতে হবে।

•   দানারারঃ খৈল, ভূষি, চালের কুড়া , খুদ, শুটকি মাছ, ঝিনুকের গুড়া, লবন ইত্যাদি।

খাওয়ানের পরিমানঃ গরুকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী, অর্থাৎ গরু যে পরিমান খেতে পারে সে পরিমান ইউ এম এস সরবারাহ করতে হব।

•   কোন খামারী সবুজ ঘাস খাওয়াতে চাইলে প্রতি ১০০ কেজি কাঁচা  ঘাসের সাথে ৩ কেজি চিটাগুড়ে মিশিয়ে তা গরুতে খাওয়াতে পারেন। এক্ষেত্রে কাঁচা ঘাসেও গরুকে পর্যাপ্ত পরিমানে সরবরাহ করতে হবে।

খ . দানাদর মিশ্রণঃ খামারীদের সুবিধার জন্য নীচের সারনীতে একটি দানাদার মিশ্রণ তৈরীর বিভিন্ন উপাদান পরিমান সহ উল্লেখ  করা হল। নিম্নের ছক অনুযায়ী অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী খামারীগণ বিভিন্ন পরিমান মিশ্রণ তৈরী করে নিতে পারবেন।

•  খাওয়ানের পরিমানঃ গরুকে তার দেহের ওজন অনুপাতে দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। পাশের দানাদার মিশ্রণটি গরুর ওজনের শতকরা ০.৮-১ ভাগ পরিমান সরবরাহ করলেই চলবে।

•    খাওয়ানোর সময়ঃ দানাদার মিশ্রণটি এবারের না খাইয়ে ২ ভাগে ভাগ করে সকালে এবং বিকালে খাওয়াতে হবে।

•    পানিঃ গরুকে পর্যান্ত পরিমানে পরিস্কার খাবার পানি সরবরাহ করতে হবে।
 
০৬. দৈহিক ওজন নির্ণয়ঃ মোটাতাজাকরন প্রক্রিয়ায় গরুকে দৈহিক ওজন নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কেননা গরুর খাদ্য সরবরাহ,ঔষধ সরবরাহ ইত্যাদি কাজগুলো
করতে হয় দৈহিক ওজনের ভিত্তিতে।

গরুর ওজন নির্নয়ের জন্য গরুকে সমান্তরাল
জায়গায় দাড় করাতে হবে এবং ছবির নির্দেশিকা মোতাবেক ফিতা দ্বারা দৈর্ঘ্য ও বুকের বেড়ের মাপ নিতে হবে। এই মাপ নীচের সূত্রে বসালে গরুর ওজন পাওয়া যাবে।

দৈর্ঘ্য × বুকের বেড় (ফুট) × বুকের বেড় (ফুট)
....................................... = ওজন (কিলোগ্রাম)  ৬.৬০

উপসাংহারঃ উপরে বর্নিত পদ্বতি অনুযায়ী পালন করলে ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই গরু মোটাতাজাকরন করে বাজারজাত করা সম্ভব।

______________________________

সৌজন্যেঃ

কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

গরুর শারীরিক বৃদ্ধি ও প্রজনন

অামরা গরু ছাগলের খাবারের পিছনে দৈনিক শত শত টাকা খরচ করলেও না বুঝার কারণে মাত্র ২০-৩০ পয়সা খরচ না করার ফলে দীর্ঘমেয়াদী অনেক ক্ষতির সম্মূক্ষিণ হচ্ছি তা অামরা জানিই না। যেমন অামরা প্রতিদিনই গরুকে ডিসিপি বা লাইম পাউডার বা ঝিনুক গুড়া দিচ্ছি কিন্তু তা সঠিক ভাবে শোষন হচ্ছে না শুধু মাত্র ভিটামিন ডি না থাকার কারণে। ফলাফল দাড়াচ্ছে অামরা খরচ করছি কিন্তু ফলাফল শূণ্য এবং গরুর শরীরের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। ফলে নানাবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তেমনি ভিটামিন এ এর অভাবেও গরুর গ্রথ সহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তা দৈনিক মাত্র ২০-৩০ পয়সায় এসব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। অনেকে তিন মাস পরপর এ সব ইনজেকসান দিয়ে থাকেন। এর সমস্যা হল ভিটামিন ই শরীরে সামান্য জমা হলেও ভিটামিন ডি শরীরে শোষন হয়না। তাই এর ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিদিনই খেতে দিতে হবে।

গরুর শাররীক বৃদ্ধি, প্রজনন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যে তিনটি ভিটামিন A, D এবংE গরুর জন্য অত্যাবশকীয় কিন্তু সামন্য ভিটামিন ই ছাড়া বাকি দুটি রেশনে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যারা দানাদার খাবার ও শুকনা খড়ের উপর নির্ভরশীল তাদের রেশনে এই তিনটি ভিটামিন পাওয়া যায় না বললেই চলে। কিন্তু এই তিনটি ভিটামিন গরুর গ্রথ, প্রজনন ও সু স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য্য তা আমরা অনেকেই জানি না বা জানলেও মানি না। একে করে অাপনার কতটুকু ক্ষতি হচ্ছে তা অাপনি জানেন না। নিন্মে ভিটামিন তিনটির সংক্ষিপ্ত অালোচনা করা হল।

ভিটামিন এ উৎস
ভিটামিন- এ কোন দানাদার খাদ্যে পাওয়া যায় না কারণ এটি সূর্য়্যের তাপে বা অতিরিক্ত তাপে নষ্ট হয়ে যায়। শুধুমাত্র প্রাণিজ উৎস (যেমন মাছ, মাংস ডিম, দুধ) ও সবুজ কাঁচা ঘাসে ভিটামিন এ পাওয়া যায়। কিন্তু গরুকে প্রাণিজ উৎস থেকে খাবার প্রদান করা প্রায় অসম্ভব। এবং কাঁচা ঘাসে খুব অল্প পরিমাণে ভিটামিন – এ থাকে তাই সাপ্লিমেন্ট দেওয়া জরুরী।

পরিমাণ
গরু মোটাতাজাকরনের জন্য রেশনে ২২০০ IU/Kg, গর্ভবতী গরুর জন্য ২৮০০ IU/Kg এবং দুধের গরুর জন্য ৩৬০০ IU/Kg ঘনত্ব থাকা জরুরী। তাই সঠিক পরিমাণে সরবরাহের জন্য ভাল ভাবে হিসাব করা জরুরী।

ভিটামিন এ এর অভাবে যে লক্ষণ গুলো পরিলক্ষিত হয় খাবার গ্রহন কমে যাওয়া, লোম রুক্ষ হয়ে যাওয়া, হাড়ের জোড়া ও চোয়াল ফুলে যাওয়া, গ্রথ কম হওয়া, অতিরিক্ত অভাবে নিয়মিত ওজন কমতে থাকা, কোন কারণ ছাড়াই প্রায় পাতণা পায়খানা হওয়া, হাড়ের গঠন ঠিকমত না হওয়া, গভর্পাত হওয়া, সিমেন কোয়ালিটি খারাপ হয়ে যাওয়া, শরীরে নানা স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া, রাতকানা রোগ হওয়া, অন্ধ বাছুর জন্ম দেওয়া, খাবার গ্রহন কমে যাওয়ার কারণে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া সহ অারো শারিরিক সমস্যা দেখি দিতে পারে। তাই কোন ভাবেই যেন ভিটামিন এ ঘাটতি না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখা।

ভিটামিন – ডি
হাড়ে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস অ্যাবজর্ব এর জন্য ভিাটামিন ডি অত্যাবশকীয়। ভিটামিন ডি এর অনুপস্থিতে শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ঘাটতি দেখা দিবে। ভিটামিন ডি দুই ধরনের হয় – ভিটামিন ডি২ যা উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায় ও ডি৩ যা প্রাণিজ খাবার থেকে পাওয়া যায়। ভিটামিন ডি৩ ফ্যাট সলিবল তাই অতিরিক্ত মাত্রায় দেওয়া যাবে না। ভিটামিন ডি এর অন্যতম অারেক উৎস হল সুর্যালোক। প্রতিদিন গরুকে রোদে দিলে অারো বেশি ভিটামিন ডি উৎপন্ন হবে।

কতটুকু প্রয়োজন
মোটাতাজাকরনের জন্য ২৭৫ IU/Kg, এবং দুধের গরুর জন্য ৩৫০-৪০০ IU/Kg প্রয়াজন।

ভিটামিন – ডি এর অভাবে যে লক্ষণ গুলো পরিলক্ষিত হয়। ভিটামান ডি এর অভাবে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষন না হওয়া কারণে গ্রথ কমে যাওয়া দুধের গরুর মিল্ক ফিভার হওয়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, বাছুরের রিকেট হওয়া, গরু ঠিক মত অনেকক্ষন দাড়াতে পারবে না, শরীর কাপঁতে থাকবে, দুধের ঘনত্ব কমে যাবে, হাড় দুর্বল হয়ে যাবে। সহজে বুঝার ব্যবস্থা হল গ্রুথ কমে যাবে গরু সবসময় হাপাতে থাকবে, শরীর অতিরিক্ত দুর্বল থাকবে ও হজমে সমস্যা দেখা দিবে।

ভিটামিন ই
ভিটামিন ই হল ফ্যাট সলিবল একপ্রকার এন্টিওক্সিডেন্ট যা ফ্যাটে অক্সিজেন শোষনের পর কোন ক্ষতির কিছু থাকলে ভিটামিন ই তা নিউট্রালাইজ করে। ভিটামিন ডি সাধারনত পালং শাক, ধনিয়া পাতা, মুলা শাক, সরিষার শাক, বাদাম জাতীয় খাবার, খৈলে পাওয়া যায় তবে তা খুব বেশি পরিমানে নয়। তাই চাহিদা পূরণের জন্য সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন।

ভিটামিন ই রেশনে কতটুকু প্রয়োজন তা অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমন সালফার সমৃদ্ধ অ্যামিনো এসিড কতটুকু অাছে, রেশনে কতটুকু সেলিনিয়াম অাছে, রেশনে কতটুকু পলিস্যাটুরেটেড ফ্যাট (যা অামরা কখনই হিসাব করিনা) অাছে। সাধারনত শরীরে ভিটামিন ডি এর মতই ভিটামিন ই খুব বেশি একটা জমা হয় না তাই নিয়মিত প্রদান করতে হবে। রেশনে ভিটামিন ই সর্বনিন্ম ১৫-২০ IU/Kg থাকতে হবে। তবে ফিনিশিং ও ডেইরীর জন্য তা ৫০-৬০ IU/Kg পর্যন্ত দিতে হতে পারে।

ভিটামিন ADE সাপ্লিমেন্টের প্রয়োগ
যেহেতু এইতিনটি ভিটামিন রেশনে পাওয়া যায় না তাই সাপ্লিমেন্টন্ দিয়ে উপায় নেই। অামার জানা মতে স্কয়ার ফার্মা “ES-ADE Solution” এবং এসিআই ‘Acivit – ADE Oral Solution’ নামে বাজারজাত করছে। যার প্রতি মিলিতে ভিটামিন A-1 Lac IU, D- 20,000 IU এবং E -20mg অাছে।যার ১০০ মিলি দাম ১৫০-১৬০ টাকা। তবে বড় প্যাক ক্রয় করলে খরচ কম পড়বে। তবে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের এই প্রোডাক্ট থাকলে এবং সমপরিমান উপাদান ও দাম ঠিক থাকলে তাও ব্যবহার করতে পারবেন।

ব্যবহারের নিয়ম
সঠিক ও নিখুঁত ভাবে ব্যবহার করতে চাই অনেক বিষয় বিবেচনায় অানতে হবে এবং জানতে হবে। তাই সকলেই যেন সহজে ব্যবহার করতে পারে সেইদিকে লক্ষ রেখে এটি অামি ব্যক্তিগতভাবে ফর্মুলাটি তৈরি করেছি। কারো কাছে ভাল পরামর্শ থাকলে দিবেন এতে সকলেরই উপকার হবে। ঔষধ কোম্পানী প্রতি মিলিতে যে পরিমাণ উপাদান অাছে উল্লেখ করেছে তা বিদ্ধমান থাকলে নিন্মরূপে খাওয়ালে ভিটামিন এ এবং ডি এর চাহিদা পূর্ণ হবে। তবে এখানে যে পরিমাণ ভিটামিন ই অাছে তা দিয়ে ই এর চাহিদা সম্পূর্ণ হবে না তাই প্রাকৃতিক ভাবে রেশন থেকে পূর্ণ করতে হবে।

১ লিটর জলতে ১.২৫ মিলি ভিটামিন এডিই ভাল ভাবে মিশ্রিত করবেন। এর পর ২০ কেজির বেশি দুধ দেয় এমন গরুকে ৫০০ মিলি, ১৫ কেজি দুধের গরুকে ৪০০ মিলি, ১০ দুধের গরুকে ৩০০ মিলি, ৫ কেজি দুধের গরুকে ২০০ মিলি দিবেন। মোটাতাজাকরনের ক্ষেত্রে ১০০ কেজি বা কম ওজনের গরুকে ৫০-৬০ মিলি, ২০০ কেজি গরুকে ১০০ মিলি, ৩০০ বা তার অধিক ওজনেন গরুকে ১৫০ মিলি দিবেন। তবে যারা দীর্ঘদিন যাবৎ এই ভিটামিন তিনটি দিচ্ছেন না তারা প্রথম সাত দিন ১ লিটার জলতে ৫ মিলি ভিটামিন মিশিয়ে খাওয়াবেন। একদিনের মিশ্রন পরের দিনের জন্য রাখবেন না। ভিটামিন মিশ্রিত জল দানাদার খাবার বা সাদা জলর সাথে বা অন্য যেকোন ভাবে খাওয়ালেই হবে তবে যেন নষ্ট না হয়। এখানে উল্লেখ্য যে ১ মিলি পরিমাণ মাপার জন্য বাচ্চাদের ঔষধ খাওয়ানোর জন্য ড্রপার ব্যবহার করতে পারেন অথবা হাটখোলা বা মিডফোর্ড থেকে মাপার সরঞ্জাম ক্রয় করে নিতে পারেন এবং ৫০/১০০ মিলি মাপার জন্যও ঔষধের ছোট বোতল ব্যবহার করতে পারেন। এখানে অামি একটি কথা অাবারো বলছি, ভিটামিন নিখুত পরিমাণে দিতে চাইলে যে হিসাব অাসবে তা অনেকে বুঝতে অসুবিধা হবে তাই সহজ ভাবে বুঝানোর জন্য এই ভাবে ব্যবহার করতে বলা হলো।

গবাদি পশুর রুমেনর ph নিয়ন্ত্রনের কৌশল গরুর রুমেনের স্বাভাবিক ph ৬.৫- ৭.০। কিন্তু খাবারের ভারসাম্যহীনতার জন্য কখনও ph স্বাভাবিক এর চেয়ে কম বা বেশি হয়ে যায়। এতে করে খাবারে অরুচি, বদহজম দেখা দেয়, খাবার গ্রহন কমে যায়, দুধের উৎপাদন ও দুধের ফ্যাট কমে যাওয়াসহ নানা ধরণের মেটাবলিক এবং শরীরবৃত্তীয় সমস্যা দেখা দেয়। এইসব সমস্যা থেকে পরিত্রান পেতে নিন্ম লিখিত নিয়ম গুলো মেনে চললে সহজেই রুমেন ph নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব।

রুমেন ph নিয়ন্ত্রনের জন্য মোট রেশনের ৬০% এর বেশি দানাদার খাবার দেওয়া ঠিক হবে না। দানাদার খাবারে ৫০-৬০% এর বেশি স্টার্চ ও সুগার হওয়া যাবে না। দানাদার খাবার তিন বারে নিদিষ্ট সময়ে প্রদান করুন। এতে পাকস্থলীতে বেশি সময় ফারমেনটেশন/ গাঁজন হতে পারবে না। গরুকে জাবর কাটার সময় দিতে হবে। কারণ জাবর কাটার সময় যে লালারস নির্গত হয় তা ক্ষারীয় যা ph এর ভারসাম্য রক্ষা করে। অামরা অনেক সময় মিনারেল ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট দেই তা দানাদার খাবারে উপস্থিত মিনারেলের সাথে যোগ করে প্রয়োজন ও টলারেন্স এর মধ্যে রাখতে হবে। গরুকে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ জল দিতে হবে। জলর সল্পতার কারণে রুমেন ও রক্তের ph হ্রাস পেতে পারে। খাাবার পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে যাতে ব্যকটেরিয়া জমতে না পারে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল দিলে শরীরে মিনারেল ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই জলর সাথে লবন, চিটাগুড়, ভূষি মিশাবেন না এতে জলর স্বাদ পেয়ে বেশি খেয়ে ফেলতে পারে। পরিমাণের বেশি ইউরিয়া সাপ্লিমেন্ট দিবেন না। বর্ষাকালে বা জলাবদ্ধ জায়গা থেকে ঘাস দেওয়ার সময় ইউরিয়া সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করবেন না। এতে রুমেন ph মারাত্নক ভাবে কমতে পারে। রেশনে মিনারেলের পরিমাণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি এবং ম্যাক্সিমাম টলারেন্স এর বেশি খাওয়ানো হচ্ছে কিনা সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেমন ডাল জাতীয় খাবারে অায়রন, চিটাগুড়ে সালফার, ধানের কুড়ায় ম্যাগনেসিয়াম অনেক বেশি থাকে। তাই পরিমান মত না খাওয়ালে রুমেন ph কমে যেতে পারে।

_______________________________
সূত্র: বিকাশপিডিয়া টীম

খাদ্য প্রস্তুত

বিভিন্ন খাদ্যের পুষ্টিগুণ, সবুজ ঘাসের প্রয়োজনীয়তা এবং তাদের সঠিক ভাবে ব্যবহার সন্মন্ধে জানা থাকলে দুধ উৎপাদন বাড়ে এবং ব্যায়ভার অনেকটা কমে জায়। অন্যদিকে অল্প খরচে গ-পুস্টি পূরণের প্রয়োজনে আমরা এলাকাভিত্তিক সহজলভ্য বিভিন্ন প্রকার প্রাণী খাদ্যের ব্যবহার করতে পারি। গোখাদ্যতন্তু জাতীয় খাদ্য (Roughage) তন্তু জাতীয় খাদ্যে তন্তু বেশি থাকে, আমিষ কম থাকে এবং আয়তন অনেক বেশী। যেমন – ধান বা গমের খড়, শাকসবজি, মূলজাতীয় খাদ্য, চাষ করা সবুজ ঘাস (লুরসান, বারসীম, হাইব্রিড নেপিয়ার, গীনি ঘাস), গাছের পাতা।

দানা জাতীয় খাদ্য
দানা জাতীয় খাদ্য সুপাচ্য, পুষ্টিকর, দেহের প্রয়োজনীয় সবকটি উপাদান এই খাদ্যে বেশী থাকে। এই খাদ্যে বেশী শর্করা বা শ্বেতসার, প্রোটিন, ফ্যাট, খনিজ পদার্থ থাকে। যেমন- গম ভাঙ্গা, ভুট্টা, খুদ, ডালের খোসা, সরষে, তিল বাদাম খোসা ইত্যাদি।

খাদ্যে পুষ্টিকর পদার্থ
খাদ্য তালিকা তৈরি করতে গেলে খাদ্যের বিভিন্ন উপকরণগুলি পুষ্টিকারক পদার্থ সম্পর্কে একটা জ্ঞান থাকা অতি অবশ্যয় প্রয়োজন। যে কোন প্রাণী খাদ্যে এরূপ ছয়টি পুষ্টিকারক পদার্থ থাকে।

শর্করা বা শ্বেতসার জাতীয় খাদ্যঃ প্রাণীদেহে প্রয়োজনীয় শক্তির প্রধান উৎস কার্বোহাইড্রেড যা প্রধানত তন্তজাতীয় খাদ্য থেকে পাওয়া যায়।

প্রোটিন জাতীয় পদার্থঃ দেহ গঠন দেহের ক্ষয়ক্ষতি মেরামতির কাজে, সর্বোপরি দুধ উৎপাদনে প্রোটিনের ভূমিকা অনেক, ডালের খোসা, সরষে ও তিল এর খোল এই জাতীয় পদার্থের প্রধান উৎস।

প্রাণীজ ফ্যাট জাতীয় পদার্থঃ শক্তি উৎপাদনের জন্য খাদ্যের মধ্যে রাখা হয়। প্রাণীর শরীর রক্ষার ও অস্থির গঠনের জন্য খনিজ পদার্থের বিশেষ প্রয়োজন, প্রজনন ক্ষমতা বজায় রাখার জন্যও খনিজ পদার্থের উপযোগিতা রয়েছে। উদ্ভিদজ খাদ্যে এই খনিজ পদার্থ অল্প পরিমাণ থাকে প্রাণীর প্রয়োজনের তুলনায় কম। বাইরের থেকে প্রাণীর খাদ্যে খনিজ লবণ মেশানো হয়।

ভিটামিনঃ দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য, বিভিন্ন রোগ ব্যাধির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ভিটামিন অত্যন্ত প্রয়োজন। সবুজ তাজা গোখাদ্য – মোটা পাতা যুক্ত শাকসবজি যেমন – বাঁধাকপি, পুঁই ইত্যাদির মধ্যে ভিটামিন জাতীয় পদার্থ থাকে।

জলঃ জল দেহের তাপমাত্রা ঠিক রাখা, দূষিত পদার্থকে দেহ থেকে বার করা ইত্যাদির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যের পুষ্টিগুণ বাড়ানো যায়ঃ

খড়ের গুনমান বাড়ানোর জন্য খড়কে কেটে জলে ভিজিয়ে খাওয়ালে খড়ের সুস্বাদুতা বাড়ে এবং কিছুটা গুনমান বাড়ে।

৪ কেজি ইউরিয়া ৩০ লিটার জলে গুলে ১০০ কেজি খড়ের গাদা দেওয়ার সময় অল্প অল্প করে ছিটিয়ে দিয়ে দু একজন লোক খড়ের গাদার উপর উঠে একটু চাপ দেবে যাতে ভিতরের হাওয়া বেরিয়ে যায়। তারপর পলিথিন দিয়ে চাপা দিতে হবে। ২১ দিন পর এই খড় খাওয়ানো যেতে পারে। সাবধানতা ৬ মাসের কম বয়সের বাছুরকে খাওয়ানো চলবে না, পর্যাপ্ত পরিমাণ জলের ব্যবস্থা করতে হবে।
গ্রামে কিছু লতাপাতা, কচুরীপানা ইত্যাদিকে খুদ বা কুড়ো সাথে সিদ্ধ করে দিতে পারি এবং অদের কাছে সহজে গ্রহণীয় হয়।

সুষম খাদ্য কিভাবে পাবেন এপিক বা অনেক সংস্থা সুষম খাদ্য তৈরি করে। কিনে নেওয়া যায় অথবা নিজেই তৈরি করতে পারেন।

সুষম খাদ্যের উপাদান    পরিমাণ (প্রতি ১০০ কেজিতে)
ভুট্টা / গম /যব    ২৫-৩৫ কেজি
বাদাম / তিল / সরষে    ২৫-৩৫ কেজি
গমের ভুষি / চালের ভুষি    ১০-১৫ কেজি
ডাল / মটর / ছোলা চুনী    ৫-১০ কেজি
খনিজ লবন    ২ কেজি
খাদ্য লবন    ১ কেজি
ভিটামিন    ২০-৩০ গ্রামখাবারের পরিমাণসাধারনত
তিনটি অবস্থায় গরুর খাবারের প্রয়োজন। যেমন শরীর রক্ষা, গর্ভধারণ ও দুধ উৎপাদন। প্রতিদিন একটি দেশী গরুর জন্য।

বিভিন্ন অবস্থা    সুষম খাদ্য    সবুজ খাদ্য    বিচালি
শরীর রক্ষা    ১-১.৫ কেজি    পর্যাপ্ত পরিমান (১-৫) কেজি    ৪ কেজি
দুধের জন্য   
অতিরিক্ত ১ কেজি প্রতি

২.৫ কেজি দুধের জন্য

ঐ    ঐ
গর্ভাবস্থায় (৮ মাস ধরে)    অতিরিক্ত ১.২৫ কেজি    ঐ    ঐ নজর রাখা দরকার গরুকে প্রয়োজনের বেশী খাবার খাওয়ানো উচিৎ নয় এবং পচা বা নষ্ট খড় খাওয়ানো যাবে না। এতে শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় না গরুর দুধেও খারাপ গন্ধ হতে পারে। চাষ করা সবুজ ঘাস, খড় কেটে খাওয়ানো প্রয়োজন আছে সঙ্গে বানানো বা কেনা সুষম খাদ্যকে মিশিয়ে খাওয়ালে ভালো হয়। নতুন কোন খাদ্য প্রথমে অল্প পরিমাণে দিয়ে শুরু করতে হবে। পরে পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। হঠাৎ করে কোন খাবারকে খাদ্যতালিকা থেকে পরিবর্তন করা ঠিক নয়, এতে হজমের ক্ষতি হতে পারে। সরষের খোল শুকনো না খাইয়ে একরাত্রি ভেজানো খোল খাওয়ানো উচিৎ। তৈরি খাবার ১ মাসের মধ্যে ব্যবহার করা উচিৎ, খাবার যেন পচা বা গুমা না হয়।

গবাদি পশুর সুষম খাদ্য

যে খাবার ছয় প্রকার খাদ্য উপাদান পরিমিত পরিমাণে সরবরাহ করে তাকে সুসম খাবার বলা হয়। যেমন- শ্বেতসার বা শর্করা, আমিষ বা প্রোটিন, চর্বি বা তেল, খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি।

সুষম খাদ্য
০ শরীরে শক্তি ও কাজ করার ৰমতা দেয়।
০ শরীরের বৃদ্ধি ও ৰয় পূরণ করে।
০ শরীরকে রোগমুক্ত রাখার সাহায্য করে।

গবাদিপশুর খাদ্য প্রধানত দু’ভাগে বিভক্ত ১. ছোবড়া বা আঁশজাতীয় খাদ্য। ২. দানাদার খাদ্য।

ছোবড়া বা আঁশওয়ালা খাদ্য
এ প্রকার গোখাদ্যে আয়তনের তুলনায় পুষ্টি উপাদন তুলনামূলক কম থাকে। এটি প্রধানত শ্বেতসার বা শর্করাজাতীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে থাকে। এর পাচ্যতা কম তবে জাবর কাটা প্রাণীদের জীবনধারণ, বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য এ খাদ্যর পরিমিত সরবরাহ প্রয়োজন। ছোবড়াজাতীয় গোখাদ্যগুলো হল লেগুম বা শিমজাতীয় কচি ঘাসের খড়, নাড়া, খড় বা বিচালি, গোচারণ ঘাস এবং রৰিত ঘাস।

দানাদার খাদ্য
যেসব খদ্যে আয়তনের তুলনায় খাদ্যমান অপেৰাকৃত বেশি এবং সহজপাচ্য তাকে দানাদার খাদ্য বলা হয়।

দানাদার গোখাদ্যগুলো হল চালের কুঁড়া গমের ভুসি, ভুট্টা, বিভিন্ন প্রকার খৈল, কলাই, ছোলা, খেসারি, সয়াবিন ও শুকনো মাছের গুঁড়া ইত্যাদি।

আমিষের পরিমাণ ভিত্তিতে দানাদার খাদ্যগুলোকে তিন ভাগে করা যায়। ক. কম আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- কুঁড়া, ভুসি ইত্যাদি (৫-১৫% আমিষ)। খ. মধ্যম আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- খৈল, কলাই, ছোলা ইত্যাদি ২০-২৫% আমিষ। গ. উচ্চ আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- শুকনো মাছের গুঁড়া কসাই খানার মাংসের কণা, রক্তের গুঁড়া ইত্যাদি ৩৫-৪৫% আমিষ।

বাছুরের খাদ্য
বাছুর প্রসবের পরেই বাছুরকে তার মায়ের প্রথম দুধ অর্থাৎ কাচলা দুধ খাওয়াতে হবে। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণ রোগ প্রতিরোধক উপাদান রয়েছে। বাছুরের প্রধান খাদ্য দুধ কারণ জন্মের পর পর প্রথম সপ্তাহে বাছুর দুধ ছাড়া কিছুই খেতে পারে না। বাছুরে ওজনের প্রতি ১০ কেজির জন্য ১ কেজি দুধ প্রত্যহ খেতে দিতে হবে। গর্বর বাচ্চা ৩০ কেজির ওপর ওজন হলেও ৩ কেজি দুধ সরবরাহ করতে হবে। দুই সপ্তাহ থেকে বাছুরকে সামান্য কিছু ঘাস ও দানাদার খাবার দেয়া যেতে পারে। বাছুরের বয়স ৭-৮ মাস হওয়ার পরে যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ জাতীয় দানাদার খাদ্য দিতে হবে। প্রথমত ছোবড়াজাতীয় খাদ্য না দিয়ে সহজেপাচ্য সবুজ ঘাস দিতে হবে। বাছুরের শারীরিক বৃদ্ধি প্রধানত পরিপাক যোগ্য আমিষ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

দুধালো গাভীর খাদ্য
সাধারণত দুধালো গাভীর প্রতি ১০০ কেজির জন্য ২ কেজি খড় সরবরাহ করতে হয়। ১ কেজি খড় ৩ কেজি তাজা সবুজ ঘাসের সমতুল্য। গাভীকে প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১ কেজি শুকনো আঁশযুক্ত খাদ্য (খড়) এবং ৩ কেজি তাজা সবুজ আঁশযুক্ত খাদ্য (ঘাস) দেয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ৫০০ কেজি ওজনের একটি দুগ্ধবতী গাভীকে ৫ কেজি শুকনো খড় এবং ১৫ কেজি সবুজ ঘাস সরবরাহ করতে হবে।

দানাদার খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা দুগ্ধ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। দুগ্ধ উৎপাদনের প্রথম ৩ কেজির জন্য প্রয়োজন, ৩ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য এবং পরবর্তী প্রতি ৩ কেজির জন্য প্রয়োজন ১ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য। অবশ্য যদি দুধে স্নেহ পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৪ ভাগ বা তার নিম্নে থাকে। দুধে স্নেহ পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৪ ভাগের ঊর্ধ্বে হলে প্রতি ৩ কেজি দুধের পরিবর্তে প্রতি আড়াই কেজি দুধের জন্য ১ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্যের প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে দেশি ও সংকর জাতের গাভীকে সর্বোচ্চ ৬ কেজি এবং বিশুদ্ধ বিদেশি গাভীকে সর্বোচ্চ ৮ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হয়।

লবণের চাহিদা পূরণের জন্য গাভীকে মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০ গ্রাম খাওয়ার লবণ এবং ৬০ গ্রাম জীবাণুমুক্ত হাড়ের গুঁড়া খাওয়াতে হবে। রসদে সরবরাহকৃত সবুজ ঘাস গাভীর ‘এ’ ভিটামিনের চাহিদা মেটাতে পারে। ‘বি’ ভিটামিন গবাদিপশু স্বয়ংপ্রক্রিয়ার প্রস্তুত করতে পারে। গাভীকে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে।

গবাদিপশুকে যেসব কাঁচা ঘাস খাওয়ানো হয় তার মধ্যে নেপিয়ার ও পারা ঘাস অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও উপকারী ঘাসের উৎপাদন পদ্ধতি এবং অন্যান্য গুণাবলী সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হল-

নেপিয়ার ঘাস
গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য ঘাস। পুষ্টিকর ঘাসে দেহ গঠনকারী আমিষ উপাদানসহ প্রায় সর্বপ্রকার উপাদন মজুদ থকে। উন্নতজাতের অধিক ফলনশীল ঘাসের মধ্যে নেপিয়ার উলেৱখযোগ্য। খাদ্যমান বেশি থাকায় গবাদিপশুর জন্য এ ঘাস বেশ উপাদয় ও পুষ্টিকর। আমাদের দেশে বর্তমানে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য পতিত জমিও ক্রমশ খাদ্য শস্য চাষের আওতায় আনা হচ্ছে।। ফলে গবাদিপশুগুলো আজ চরম খাদ্য সংকটের সম্মুখীন। এ সংকট সমাধানের জন্য সীমিত জমিতে অধিক গোখাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উন্নতজাতের ঘাস চাষ করা আবশ্যক। উন্নতমানের ঘাস চাষ করা হলে গবাদিপশুর খাদ্য সমস্যা বহুলাংশে দূরীভূত হবে। ফলে মানুষের খাদ্য উৎপাদনের লৰ্যও বাধাগ্রস্ত হবে না। নেপিয়ার উন্নতজাতের ঘাস। এ ঘাসের চাষ পদ্ধতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে কৃষকরা অবগত হলে এ ঘাসের চাষে তারা উৎসাহিত হবেন। নেপিয়ার ঘাস বহু বর্ষজীবীর উদ্ভিদ। এটি গ্রামীনণ পরিবারের অন্তর্গত। এ ঘাস একবার চাষ করার পর কয়েক বছর ধরে পাওয়া যায়। এর পাতা ও কাণ্ড দেখতে কিছুটা আখ গাছের মতো। কাণ্ড গোলাকৃতি ও সবুজ বর্ণের।

জলবায়ু ও ভূমি : এ ঘাস সব ধরনের মাটিতেই জন্মে। তবে বেলে দো-আঁশ মাটিতে এর ফলন সবচেয়ে বেশি। এ ঘাসের জন্য উঁচু জমি ভালো। বন্যা পৱাবিত জমি এ ঘাস চাষের জন্য অনুপযুক্ত। বাংলাদেশের আবহাওয়া নেপিয়ার ঘাস চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত।

চাষ পদ্ধতি : এ ঘাস চাষের জন্য জমিতে ৪-৫টি চাষ দিতে হয় এবং মই দিয়ে আগাছামুক্ত করার পর রোপণ করতে হয়। দুই চোখ বিশিষ্ট কাণ্ডাংশ অথবা মূলসহ কাণ্ড চারার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ঘাস লাগানো : সারা বর্ষা মৌসুমেই এ ঘাস লাগানো যায়। তবে বর্ষার শুর্বতেই রোপণের উৎকৃষ্ট সময়। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে রোপণ করা হলে প্রথম বছরেই ৩-৪ বার ঘাস কাটা যেতে পারে। ২ চোখসহ কাণ্ডাংশ অথবা মূলসহ কাণ্ড সারিবদ্ধভাবে লাগাতে হয়। এক সারি থেকে অন্য সারিরর দূরত্ব ২-৩ ফুট হবে এবং এক চারা থেকে অন্য চারার দূরত্ব দেড় ফুট হবে। মাটিতে রস না থাকলে চারা লাগানোর পর পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত প্রতি একর জমি রোপণের জন্য ৭-৮ হাজার চারা বা কাটিংয়ের প্রয়োজন হয়।

সার প্রয়োগ ও পানি সেচ : ভালো ফলন ও গাছের বৃদ্ধির জন্য সার ও পানির প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমে পানি সেচের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু অন্য সময়ে সাধারণত পানির সেচের প্রয়োজন হয়।

জমি প্রস্তুতের সময় : ১.৫০-২.০০ টন গোবর প্রতি একরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ ইত্যাদি সার ব্যবহার করা হয়।
সাভার ডেইরি ফার্মর রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, বছরে যথাক্রমে ১১২, ৮৯ ও ৪০ কেজি নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ প্রতি একরে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইউরিয়া বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। ঘাস দু’বার কাটার পর একরপ্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে দিলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। সার ছিটানোর আগে দুই সারির মাঝের জায়গায় লাঙল অথবা কোদার দিয়ে আলগা করে দিতে হবে।

ঘাসের ব্যবহার ও ফলন : নেপিয়ার ঘাস কেটে খাওয়ানো সবচেয়ে ভালো। এতে অপচয় কম হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ফলন বেড়ে যায়। ঘাস লাগানো ৩ মাস পরে কাটার উপযোগী হয়। ৩ সপ্তাহ পর পর ঘাস কাটা যায়। প্রথম বছর ফলন কিছুটা কম হয় কিন্তু পরবর্তী ২-৩ বছর পর্যন্ত ফলন বেড়ে যায়। বছরে সাধারণত ৮-১০ বার ঘাস কাটা যায় এবং গড়ে প্রতি একরে বছরে ৩০-৪০ মেট্রিক টন কাঁচার ঘাস পাওয়া সম্ভব। কাণ্ড ঘাসের গোড়ার সঙ্গে রেখে কাটা পরবর্তী ফলনের জন্য ভালো।

জমি থেকে কেটে এ ঘাস সরাসরি গবাদিপশুকে খাওয়ানো যেতে পারে। এ ছাড়া ২-৩ ইঞ্চি করে কেটে খড়ের সঙ্গে মিশিয়েও খাওয়ানো যায়। নেপিয়ার ঘাসে শতকরা ৭ ভাগ প্রোটিন আছে। নেপিয়ার ঘাস শুকিয়ে সংরৰণ করে সুবিধাজনক নয়। তবে কাঁচা ঘাস সাইলেজ করে শুষ্ক মৌসুমে সংরৰণ করা যায়।

চারাপ্রাপ্তির স্থান
নিম্নলিখিত স্থানগুলো চারা বা কাটিং ও চাষ পদ্ধতির নির্দেশাবলী পাওয়া যায়-
০ বাংলাদেশ সরকারের গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধ খামারগুলো যেমন- গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধ খামার, সাভার, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া।
০ সব জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র।
০ সব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।

নেপিয়ার ঘাস চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রামের চাষিদের ভালোভাবে জানার সুযোগ দিতে হবে। ্‌এজন্য শুধু প্রচারণাই যথেষ্ট নয়। চাষিরা যাতে ঘাসের কাটিং বা চারা সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য প্রতিটি উপজেলাতে ঘাসের চারা বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বশেষ বলা যায়, সংশিৱষ্ট সবাইকে উৎসাহিত করা এবং নেপিয়ার ঘাস চাষের প্রচলন করা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে লাভজনক হবে।

পারা ঘাস
পারা উন্নতমানের ঘাস এবং এর চাষও করাও সহজ। দেশের অধিকাংশ কৃষক উন্নত জাতের ঘাস সম্পর্কে অবগত হন। এ ঘাসের চাষ পদ্ধতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে তারা অবগত হলে আরো উৎসাহিত হবেন।

পারা ঘাস দৰিণ আমেরিকার ঘাস কিন্তু বর্তমানে সর্বত্রই এর চাষ হয়ে থাকে। পারা একটি স্থায়ী জাতের অর্থাৎ একবার চাষ করলে কয়েক বছর ধরে ফসল পাওয়া যায়। জলীয় ও আর্দ্র অঞ্চলে এ ঘাস ভালো হয় তাই আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এটি খুবই উপযোগী। এ ঘাস দেখতে লতার মতো, কাণ্ড গোলাকৃতি ও সবুজ বর্ণের। সারা গায়ে প্রচুর সূক্ষ্ম লোম আছে।

জলবায়ু ও মাটি : উঁচু নিচু সর্বপ্রকার মাটি-জমিতেই জন্মে। এমনকি আবদ্ধ পানি ও লোনা মাটিতেও এ ঘাস জন্মানো সম্ভব। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের জন্য এ ঘাস চাষ খুবই সম্ভাবনাপূর্ণ। আম-কাঁঠালের বাগানের ফাঁকে ফাঁকে, রাস্তার দুপাশে স্যাঁতসেঁতে জায়গায়, জলাবদ্ধ স্থানে, এমনকি সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লবণাক্ত জমিতে যেখানে সাধারণত অন্য ফসলের চাষ হয় না, সেসব জমিতেও পারা ঘাস স্বার্থকভাবে চাষ করা যায। অবশ্য শীতকালে অধিক ঠাণ্ডায় এ ঘাসের উৎপাদন হ্রাস পায়।
ঘাস লাগানো : বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এ ঘাস লাগানো যায়। তবে গ্রীষ্মের আগে জমি চাষ দিয়ে প্রস্তুত করে রাখতে হবে। গ্রীষ্মে এক পশলা বৃষ্টি হলেই এ ঘাস লাগানো যেতে পারে। এ ঘাস লাইন করে ১.৫ঢ১.৫ ফুট ব্যবধানে রোপণ করতে হয়। তবে এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব তেমন ধরাবাধা নিয়ম নেই। কারণ এ ঘাস অল্প সময়ে সব জমিতে বিস্তার লাভ করে। কাণ্ডাংশগুলো মাটির সঙ্গে ৬০ ডিগ্রি কোন করে লাগালে ভালো ফল পাওয়া যায়। ঘাসের কাণ্ড অথবা শিকড়যুক্ত ঘাসের গোড়া চারার জন্য ব্যহৃত হয়। কাণ্ড ছেদনের সময় লৰ রাখতে হবে প্রতি খণ্ডে যেন ২-৩টি গিট থাকে।

সার প্রয়োগ ও পানি সেচ : পারা ঘাসের চাষের জন্য বিশেষ কোনো যত্ন নিলেও চলে। তবে ভালো ফসলের জন্য জমি প্রস্তুতের সময় প্রতি একরে ৪ টন গোবর অথবা কম্পোস্ট সার এবং ৩৫ কেজি টিএসপি প্রয়োগ করতে হবে। ঘাস লাগানোর ২-৩ সপ্তাহ পর একরপ্রতি ৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হয়। প্রতিবার ঘাস কাটার পর একরপ্রতি ৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হবে।

সাভার ডেইরি ফার্মের রিপোর্ট অনুসারে একরপ্রতি বছরে ১১২ কেজি নাইট্রোজেন, ৮০ কেজি ফসফরাস এবং ৪০ কেজি পটাশ প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ময়লাযুক্ত পানি এবং গোয়াল ঘর ধোয়া পানি ও আবর্জনা এ ঘাসের জমিতে প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের চাষিদের কাছে এ ঘাস চাষ নতুন বিষয়। তাই ঘাসের চাষ পদ্ধতি এবং গুণাগুণ সম্পর্কে চাষিদের ভালোভাবে জানার সুযোগ দিতে হবে। এজন্য ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন।

চারা প্রাপ্তির স্থান
নিম্নলিখিত স্থানগুলোতে চারা বা কাটিং ও চাষ পদ্ধতির নির্দেশাবলী পাওয়া যায়-
০ বাংলাদেশ সরকারের সব গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধ খামারগুলো যেমন- গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধ খামার, সাভার ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও বগুড়া।
০ সব জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র।
০ সব জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
০ সব জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
০ বন বিভাগ ও নার্সারিগুলো।

চারা কাটিংসপ্রাপ্তি সম্বন্ধে সংশিৱষ্ট দপ্তরে আগেই পত্রালাপ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ করে নেয়া ভালো। নিজের গর্ব না থাকলেও আজকাল এ ঘাস বিক্রয় করে লাভবান হওয়া যায়।

ঘাসের ব্যবহার ও ফলন : পারা ঘাস দ্র্বত বর্ধনশীল ঘাস। যখন ২৪-৩২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয় তখনই এ ঘাস কাটার উপযুক্ত সময়। ঘাস লাগানোর ৩ মাস পরই কাটার উপযুক্ত হয় এবং এরপর প্রায় প্রতি মাসেই ঘাস কাটা যায়। বছরের প্রায় ৮-১০ বার ঘাস কাটা যায় এবং প্রতি একরে বছরে ২০-২৫ মেট্রিক টন কাঁচার ঘাস পাওয়া সম্ভব। এ ঘাস গর্বকে কেটে খাওয়ানো যায়। তবে গর্ব চরিয়ে খাওয়ানো লাভজনক। এ ঘাসে শতকরা ১২ ভাগ আমিষ রয়েছে। এটি একটি সুস্বাদু ঘাস। গবাদিপশুর কাছে এ ঘাস খুবই পছন্দনীয়। সর্বশেষে বলা যায়, সংশিৱষ্ট সবাইকে উৎসাহিত করা এবং পারা ঘাস চাষের প্রচলন করা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে লাভজনক হবে।
____________________________
তথ্যসূত্র: মো. আবু আল মনসুর, অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, কুমিল্লা।

No comments:

Post a Comment